‘ইউটিউব ভর্তি ডিজইনফরমেশন’ এর মূল সূত্র কোথায় ?

0
99
ডিজইনফরমেশন

‘ইউটিউব ভর্তি ‘ এর মূল সূত্র কোথায়? 

‘সেনাবাহিনীকে একি বললো জাতিসংঘ’ , ‘এই মাত্র পাওয়া দুঃসংবাদ‘, ‘ভোট কারচুপির দায়ে নির্বাচন কমিশনারের আত্মসমর্পন, সংসদ ভেঙে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ‘, ‘ঘুরে দাড়িয়েছে পুলিশ, দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে ফ্যাসিস্ট সরকার‘, ‘ভারত বলছে নির্বাচন একটুও সুষ্ঠ ছিলো না, এইমাত্র পাওয়া খবর ১৮/০২/২০২৪‘, ‘সেনাবাহিনীকে একি বললো আমেরিকা? পদত্যাগ করে আবারও নির্বাচন‘ । ইউটিউবে এমন অসংখ্য ভিডিও দেখা মেলে গত কয়েকদিন জুড়ে। প্রতিদিন এমন শিরোনামে কমপক্ষে ৩০-৪০টির অধিক ভিডিও প্রচার করা হয় নামে-বেনামে পরিচিত প্রায় শ খানেক ইউটিউব চ্যানেল থেকে। যার মূল লক্ষ্যই থাকে ‘আওয়ামী লীগ সরকার ও বাংলাদেশ বিপদে রয়েছে’ এই বার্তা প্রচার করা।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের ভাষ্য মতে, এ ধরণের গুজব প্রচারের মূল লক্ষ্য ক্ষমতাসীন সরকারের ডিজইনফরমেশন প্রতি অনাস্থা তৈরি এবং সরকার বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে চাঙ্গা রাখা। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, এ ধরণের গুজবে প্রাথমিকভাবে নেতাকর্মী চাঙ্গা করা গেলেও বর্তমানে সরকার বিরোধী দলগুলোর তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও এ ধরণের ভিডিওর বার্তায় বিরক্ত।

এসব ভিডিওর মূল বিষয়গুলোকে মোটা দাগে ভাগ করলে যা মেলে তা হলো- বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা , সহিংসতার বিভ্রান্তিকর তথ্য, সামরিক অভ্যত্থান বা ক্যু এবং সরকার পতন । তবে প্রতিটি ভিডিওতেও আক্রমণ করা হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার সভাপতি শেখ হাসিনাকে। মূলত বর্ণনামূলক এই ভিডিওতে দেখা যায় কোন এক ব্যক্তি বা একাধিক ব্যক্তি কোন একটা সত্য ঘটনাকে অবলম্বন করে তার মতো করে মিথ্যার ডানা মেলতে থাকে এবং নিজের মন গড়া বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করতে থাকে। এই ভিডিওগুলোর প্রতিটিতেই উদ্ভোট এবং আকর্ষণীয় মিথ্যায় ভরা থাম্বনিল ব্যবহার করা হয়। যা দেখে মানুষ আকৃষ্ট হয়ে ভিডিওগুলোতে ক্লিক করেন। যেমনটা শুরুতেই উদাহরণ সহ কিছু ভিডিওতে দেখা গেলো।

তবে এ সকল বেনামি ইউটিউবাররা যে সকল ভিডিও ক্লিপ বা তথ্য নিজেদের ভিডিওতে সাধারণত ব্যবহার করেন, তার সুনির্দিষ্ট কিছু সূত্র রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এ ধরণের নামসর্বস্ম ইউটিউবারদের সবচাইতে পছন্দ তৃতীয় মাত্রা নামক টকশো ম্যাগাজিনের উপস্থাপক ও সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) প্রধান নির্বাহী জিল্লুর রহমান । কেননা এই উপস্থাপক তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ এবং তার অধিনস্থ সিজিএস, তৃতীয় মাত্রা , তৃতীয় মাত্র + ফেসবুক পেজ থেকে ‘ক্লিক বেইট’ হিসেবে চমকপ্রদ সব শিরোনাম দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে তিনিও ব্যক্তিগত মতামতে পরিপূর্ণ সব ভিডিও প্রকাশ করেন। নিজেকে ‘ডিজইনফো ফাইটার’ বা অপতথ্যের বিরুদ্ধে যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেও তিনি নিজেই আংশিক বা নিজের মতো করে তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াবার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন জিল্লুর রহমান।

তিনিও এই ইউটিউবারদের মতই বাংলাদেশের সকল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ‘সময়ের ব্যপার’ বলে মনে করেন। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ‘বাংলা বসন্ত’ ঘটানোর কথাও বলেছেন তিনি। যদিও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে এ বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা সকল দেশ কাজ করার বিষয়ে অঙ্গীকার জানালেও জিল্লুর রহমানের ভিডিওর থাম্বে লেখা হয় ‘যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমারা আবারও সরব, মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবী‘ । এছাড়াও তার অধিনস্ত একাধিক পেজ থেকে প্রকাশ করা ভিডিওর শিরোনাম ‘আমেরিকার খেলা শুরু, ভারত-চীন কিছুই করতে পারবে না‘ ।

উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ‘ক্লিক বেইট’ এমন সব শিরোনাম দেবার পরও জিল্লুর রহমানকে নিয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য শনাক্ত করা ও মোকাবেলার উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস। বিষয়টিকে প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকার মতই মনে করা হচ্ছে । মার্কিন দূতাবাসের এই পোস্টটি জিল্লুর রহমানও তার একাধিক ফেসবুক পেজে শেয়ার করেছেন নিজেকে ‘ডিজইনফো ফাইটার’ হিসেবে প্রমাণের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা এটাই, মার্কিন বেসরকারি সংস্থা ন্যাশনাল এনডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি) থেকে গুজব মোকাবিলার জন্য অর্থ নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছেন তিনি সহ আরও বেশ কয়েক ব্যক্তি।

[‘ইউটিউব ভর্তি ডিজইনফরমেশন’ এর মূল সূত্র কোথায় ?]

এনইডি ফান্ড গ্রহণ করে পক্ষপাতমূলক এবং আংশিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এক তরফা বার্তা দেওয়া অপর প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হলেন নেত্র নিউজ নামক পোর্টালের ডেভিড বার্গম্যান  এবং  ও তাসনিম খলিল এবং সহ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত জুলকারনাইন সায়ের খান (সামি)  এবং রাইট টু ফ্রিডমের (আরটুএফ)  নামক অপর এক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাবেক সহকারী প্রেস সচিব মুশফিক ফজল আনসারী, সাবেক মার্কিন কূটনীতিক উইলিয়াম মিলাম ও তার শিষ্য হিসেবে পরিচিত জন ড্যানিলোভিজ

এদের প্রত্যেকের লেখা, বক্তব্য ও উপস্থাপনায় ৩টি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়, এক. সরকার মহাবিপদে রয়েছে, দেশ বিপদে রয়েছে; দুই. বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পশ্চিমা দেশগুলো হস্তক্ষেপ করছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র (যদিও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরণের ধারণাকে কখনই সমর্থন করেনি); তিন. যে কোন সময় বাংলাদেশের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা আসতে যাচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই তিনটি বিষয়কে উপজিব্য করে চলেছে তাদের সকল আলোচনা। আর এদের আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই দৈনিক কয়েক’শ ভিডিও তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইউটিউবে। যেখানে ফ্যাক্ট চেকাররাও কোন ভূমিকা রাখছে না বা অনেক ক্ষেত্রে রাখতে পারছেন না।

 

আরও পড়ুনঃ

 

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে