‘দ্য ট্রি অব পিস’ পুরস্কার নিয়ে ড. ইউনুসের প্রতারণা

0
134
ইউনুস

একাদশ গ্লোবাল বাকু ফোরামে ড. ইউনুসকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘দ্য ট্রি অব পিস’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয় বলে গত ২১ মার্চ ইউনূস সেন্টারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রায় হুবহু প্রকাশ করে বিভিন্ন গণমাধ্যম। কিন্তু ইউনেস্কো কি আদৌ ইউনুসকে ‘দ্য ট্রি অব পিস’ পুরস্কার দিয়েছে?

গ্লোবাল বাকু ফোরাম কি?

আজারবাইজানের এনজিও “নিজামি গনজভী ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের” একটি উদ্যোগ “গ্লোবাল বাকু ফোরাম”। এ বছর এ ফোরামের একাদশ সভা হয় আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে, ১৫-১৬ মার্চ। নিজামী গনজভী ট্রাস্ট পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ট্রাস্টগুলোর একটি। আয়োজনেও থাকে জাকজমক, অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া হয় নানা সুযোগসুবিধা। এ কারণে নিজামি সেন্টারের আয়োজনে যোগ দেন বিশ্বের খ্যাতনামা অনেকেই।
এবারের একাদশ গ্লোবাল বাকু ফোরামে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রী, সরকারপ্রধান, রাজনীতিবিদ, এনজিও প্রতিনিধি, কবি, শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবক প্রমুখ। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নোবেলজয়ীও ছিলেন।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী কৈলাস সত্যার্থী, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডি।
নোবেল পুরস্কারজয়ী ড. ইউনূস সেখানে উপস্থিত থেকে বক্তব্যও রাখেন। সম্মেলনকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস ও জাতিসংঘের অন্যতম আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল উইনি বিয়ানইমা, আজারবাইজানের প্রধানমন্ত্রী আলী আসাদভের সঙ্গে কুশল বিনিয়ময় করেন ড. ইউনূস। যা নিজের ফেসবুক পেজেও পোস্ট করেন তিনি।

ট্রি অব পিস কী?

  • ইজরায়েলি শিল্পী-ভাস্কর হেডভা সের ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক কূটনীতির শুভেচ্ছাদূত। দ্য ট্রি অফ পিস হলো হেডভা সেরের একটি ভাস্কর্য। শিল্পকর্মটি হলো গাছের ডালে আকাশের দিকে মুখ করে থাকা একটি পাখি, যা জাতিসংঘের শান্তির মূল্যবোধকে প্রকাশ করে।
  • ২০১২ সাল থেকে এটি ইউনেস্কোর অফিসিয়াল ট্রফি হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ব্যক্তিকে ইউনেস্কো মহাপরিচালক কর্তৃক এই ট্রফি দেওয়া হয়।
  • ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই পুরস্কার/ট্রফি দেন ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক ইরিনা বোকোবা।
  • ২০২১ সালের ৮ জুন ইউনেস্কো মহাপরিচালক অড্রে আজুলে আলজেরিয়ার শিল্পী রশিদ কোরায়শীকে এই পুরস্কার দেন।

ইউনূসকে ট্রি অব পিস দিয়েছে ইউনেস্কো?

একাদশ গ্লোবাল বাকু কনফারেন্সে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে প্রফেসর ইউনূসের বিশেষ ভাষণ, ইউনেস্কা থেকে “দি ট্রি অব পিস” পুরস্কার গ্রহণ শিরোনামে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে ইউনূস সেন্টার। অথচ ইউনেস্কোর কোনো প্রতিনিধি বাকু ফোরামে অংশগ্রহণ করেনি, যা ইউনেস্কোর আজারবাইজানের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নিশ্চিত করেছেন।

তাহলে ইউনুসকে ট্রি অব পিস কে দিলো?

  • শিল্পী হেডভা সের নিজামী সেন্টারের ১০৫ জন (নির্বাহী) সদস্যের তিনি একজন। কাজে‍ই নিজামী সেন্টার আয়োজিত সভায় তিনি আয়োজকদের পক্ষ থেকেই উপস্থিত ছিলেন।
  • শিল্পী হেডভা সের কয়েক বছর ধরেই তার “ট্রি অব পিস”-এর প্রচারণা চালাচ্ছেন। ইজরায়েল, আবুধাবি, চীন সহ বিভিন্ন দেশে এই ভাস্কর্য স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে এর রেপ্লিকা তুলে দিয়েছেন।
  • বাকু ফোরামে ইউনুসের হাতে এই রেপ্লিকা তিনিই তুলে দেন। একই দিনে তিনি আরো কয়েকজনের হাতে এই ভাস্কর্য তুলে দেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, তার টুইটার (এক্স) হ্যান্ডেলে কয়েকজনের হাতে এই রেপ্লিকা তুলে দেওয়ার কথা উল্লেখ করলেও ইউনুসের নাম উল্লেখ করেননি।
  • ফোরামের সমাপনী ও ডিনার অধিবেশনে ৩৪ সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত আয়োজনে ইউনুসের হাতে এই ট্রফি তুলে দেওয়ার সময় উল্লেখ করা হয়, হেডভা সের তাঁর শান্তির প্রতীক “ট্রি অব পিস” তুলে দিচ্ছেন ইউনুসের হাতে।

ইউনেস্কোর অফিসিয়াল পুরস্কার নয়

কন্যাশিশু ও নারী শিক্ষার উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে “ট্রি অব পিস” সম্মাননা পান। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা শেখ হাসিনাকে এ পদক তুলে দেন। সেখানে কেন শেখ হাসিনাকে অফিসিয়ালি এ পুরস্কার দেওয়া হলো তা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে পুরস্কারের যে ছবি দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, পুরস্কারের গায়ে লেখা থাকবে, “ইউনেস্কোর মাননীয় মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে সম্মাননা”। যা শেখ হাসিনার পুরস্কারেও লেখা রয়েছে, রশিদ কোরায়শীর পুরস্কারেও লেখা রয়েছে। অথচ ইউনূসকে দেওয়া রেপ্লিকাতে লেখা আছে তাঁর নাম ও তিনি কত সালে নোবেল পেয়েছিলেন। ইউনেস্কো অফিসিয়ালি তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করছে, এমন কোনো কথা লেখা নেই।

ইউনেস্কোর আজারবাইজান কান্ট্রি রেপ্রেজেন্টেটিভ নিশ্চিত করেছেন, ইউনেস্কোর কোনো প্রতিনিধি এবারের গ্লোবাল বাকু ফোরামে অংশগ্রহণ করেননি। ট্রি অব পিস পুরস্কার প্রসঙ্গে প্যারিসে ইউনেস্কো সদরদপ্তরে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, এই ধরনের কোনো পদক ড. ইউনুস পাননি ৷

পুরস্কার নাকি ক্যাম্পেইন?

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে চলেছেন ড. ইউনুস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বন্ধুদের কাছ থেকে বিবৃতি আনা, সেই বিবৃতি মোটা অংকের টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা। সর্বশেষ একজন শিল্পীর কাছ থেকে মেমেন্টো নিয়ে, সেটিকে অফিসিয়াল পুরস্কার হিসেবে প্রচার করা ইউনুসের সর্বশেষ ধাপ্পাবাজি।

ধরা যাক, স্বাধীনতা পদকের ডিজাইন করেছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। এখন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী যদি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে তার ডিজাইনের রেপ্লিকা দেন, সেটিকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তি হিসেবে প্রচার করা হয়, সেটি অবশ্যই মুর্খতা। তবে ইউনুসের মতো ধুরন্ধর মানুষের এ মুর্খতা অবশ্যই উদ্দেশ্যমূলক। যেমন- যতবারই ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কোন আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ততবারই তিনি নানাভাবে আন্তর্জাতিক মহলকে সক্রিয় করতে চেষ্টা করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চিঠি, তারও ৪০ জন বৈশ্বিক নেতাকে দিয়ে বিবৃতি উল্লেখযোগ্য ।

আরও পড়ুনঃ 

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে