আবারও ভারতের কৃপাপ্রার্থী বিএনপি, প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি হাতে ছুটছেন নেতারা

0
288
ভারত

পাকিস্তানের সাথে জানে-জিগরি বন্ধুত্বের কারণে বিএনপির প্রতি কখনই আস্থা ছিল না প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের। এমনকি ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরবিরোধী হলেও তারা কখনই পাকিস্তানপন্থী বিএনপিকে ভালো চোখে দেখেনি। বিএনপি এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হয়নি। এজন্য দায়ী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। নিকটতম প্রতিবেশির সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার চেয়ে তারা সবসময় আস্থাশীল ছিলেন আরও দূরতম রাষ্ট্র পাকিস্থানের প্রতি। যা এখনও বিদ্যমান।

আরও পড়ুন: আইএসআই’র সাথে গোপন বৈঠকের পর পাকিস্তানের পক্ষে ওকালতিতে বিএনপি !

সবসময় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র পরামর্শে এবং মদদে কাজ করে বিএনপি। বহু বছর ধরে ভারতের অভিযোগ ছিল, সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে মদদ দিচ্ছে পাকিস্তানি কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন, যার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে আইএসআই। আর তাদেরকে নিরাপদে অস্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহের জায়গা করে দিচ্ছে বাংলাদেশ। যে ভাবনাটা মোটেই অমূলক ছিল না। যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র চালানটি আটক হওয়ার পর। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য এই অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছিলো। যা এসেছিল চীন থেকে নৌপথে।
তারেক-বিএনপি-বাবরজামায়াত নেতা- রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রাম সার কারখানার জেটিতে এসব অস্ত্র খালাস করা হচ্ছিল। তারেক রহমান ও লুৎফুজ্জামান বাবরসহ বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ পুরো অপারেশনটি পরিচালনা করেছিলেন। এই অপারেশন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াতের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের স্বরূপ প্রকাশ পেয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি বহু চেষ্টা করেও ভারতের কাছে নিজেদের ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। যদিও ২০০১ এর নির্বাচনের পূর্বে তারেক রহমানসহ বিএনপির উর্ধ্বতন নেতারা ভারতের সাথে একটি সমঝোতা করেছিল বলে জানা যায়। সে সময় বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পাকিস্থানের সাথে বিএনপি সম্পর্ক রাখবে না, জঙ্গিবাদ দমনে ভারতের সাথে মিলে কাজ করবে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিএনপি। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষিত করে তোলে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। এর ফলে ভারতের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হয় বলে ভারতের প্রধান দুই দল- কংগ্রেস এবং বিজেপির নেতৃবৃন্দ প্রায়শ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ সরকারের। যা স্বভাবতই বিএনপি এবং জোটের শরিকদের জন্য বড় আঘাত।

[আবারও ভারতের কৃপাপ্রার্থী বিএনপি, প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি হাতে ছুটছেন নেতারা]

এরপরও বিভিন্ন সময় বিএনপি চেষ্টা করেছিল ভারতের ক্ষমতাসীন নেতৃবৃন্দের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার। আর ব্যর্থ হয়ে চালিয়েছে মিথ্যাচার। ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল প্রেস ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে ফোন করে শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন, কুশলাদি বিনিময় করেন। এছাড়াও রাজনৈতিক বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। দেশের সব সংবাদমাধ্যম খবরটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। তবে আওয়ামী লীগ একে মিথ্যাচার বলে শুরুতেই দাবি করে। পরে এ নিয়ে জল ঘোলা হলে বাংলাদেশি কয়েকটি গণমাধ্যম সরাসরি বিজেপি নেতার সাথে যোগাযোগ করে। তখন অমিত শাহ জানান, ‘খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। এটি নিছক মিথ্যাচার। প্রকাশিত খবরটির কোনো ভিত্তি নেই।’ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এসব মিথ্যাচারে।

তবুও বিভিন্ন সময় ভারত সফর করেছেন বিএনপির নেতারা, কিন্তু ডাল গলেনি। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বাংলাদেশ সফর করেন। বিএনপির নেতৃবৃন্দ অনেক চেষ্টা করেও তাদের সাক্ষাৎ পাননি। পাকিস্তানের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকায় ভারতের কোনো রাজনৈতিক দলই বিএনপিকে নিরাপদ মনে করে না। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, তবে দেশের স্বার্থে তারা পাকিস্তান ও তার মিত্রদের বিশ্বাস করে না। জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপি বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে, এটা ইতিহাসের অমোঘ সত্য। পাকিস্তান প্রতি তাদের এই অপার টান থাকায় দেশটির সকল রাজনৈতিক দল আজও বিএনপির প্রশংসা করে। পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বিভিন্ন সময় উপহার সামগ্রী যায় বিএনপি প্রধানের বাড়িতে। গোপন বার্তা, ফুল, ফল, চকলেটসহ অনেক কিছুই আদান-প্রদান চলে। আইএসআই এজেন্টের সাথে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ফোনালাপ পর্যন্ত ফাঁস হয়েছিল। এছাড়া নির্বাচনে বিএনপিকে আইএসআই’র বিপুল অর্থায়নও প্রকাশিত।

আরও পড়ুন: বিএনপি নেতা ‘খন্দকার মোশাররফ’র সঙ্গে ‘আইএসআই কর্মকর্তা’র ফোনালাপ ফাঁস

এসব কারণ বিবেচনায় রেখে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী বিএনপিকে এড়িয়ে চলে ভারত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি আবারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করতে। আর এজন্য চিকিৎসার নাম করে কয়েকজন বিএনপি নেতা ভারতযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে চাউর হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার পুত্র তাবিথ আউয়ালদের নাম শোনা যাচ্ছে, যারা ভারতযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। bnp-india
তবে তাদের এই যাত্রা যে শুধুই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে, সেটা মানতে নারাজ কূটনৈতিক মহল। যে সময় নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জলঘোলা করছে বিএনপি, ঠিক সে সময় তাদের এই ভারতযাত্রা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এবারও কি কোনো প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা?

[আবারও ভারতের কৃপাপ্রার্থী বিএনপি, প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি হাতে ছুটছেন নেতারা]

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত ইস্যু একটি বড় ফ্যাক্টর। তাই প্রশ্ন উঠেছে, আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য ভারতকে কি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখতে চায় বিএনপি? সেজন্যই কি ভারতের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায়ের জন্য বিএনপি নেতাদের এই সফর? নাকি শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা চমক সৃষ্টির জন্য এই যাত্রা?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের সমর্থন পেতে হলে বিএনপিকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। বিএনপির পাকিস্তানপ্রেম ও জামায়াতসঙ্গ পছন্দ নয় ভারতের। মাফিয়া সম্রাট ও অস্ত্র ব্যবসায়ী তারেক রহমানকে দলের নেতৃত্বে দেখতে চায় না ভারত। মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রতি বিএনপির নমনীয়তা অপছন্দ ভারতের। উগ্রবাদী মতাদর্শীদেরকে নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়েও বহুবার সমালোচনা করেছে ভারত, কিন্তু কর্ণপাত করেনি বিএনপি। এবার কি এসব বিষয়ে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি হাতে ভারত যেতে চাচ্ছেন দলের নেতারা?

আরও পড়ুন:

মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে